Sunday, April 21, 2013

রাহাতনামা-১

দুই আঙ্গুলের মাঝে হাল্কা তাপ এসে লাগছে। চোখ বন্ধ করল রাহাত। কষে টান দিল দুই আঙ্গুলের মাঝে থাকা সিগারেটের গোড়ায়। দম নিতে থাকল যতক্ষণে হাল্কা তাপ প্রায় ছ্যাঁক লাগার অবস্থায় চলে না যায়। চরম তৃপ্তি পূর্ণতার টান ছিল এটা। তার লেখা শেষ। আগেই সিগারেট খেতে খেতে বারবার পড়ে নিয়ে যেখানে যা এডিটের দরকার ছিল তা শেষ করে নিয়েছিল, তবু একবার দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিয়ে "পোস্ট" বাটনে ক্লিক করল। এ সময় তার একটা মিশ্র অনুভূতি হয়। মিশন শেষ করতে পারা কমান্ডো কমান্ডো ভাবের সাথে একটা সেলিব্রিটি সেলেব্রিটি ভাবের মিশ্রণ। এ ধরণের শিশুসুলভ ভাবের জন্য সে নিজেও নিজেকে নিয়ে মজা পায়।

পোস্ট হয়ে যেত দেখে ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়াল। একটু টয়লেটে যেতে হবে, এক মগ রঙ চা বানাতে হবে, বারান্দায় খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া জোলো বাতাসের মজা নিতে হবে আর সবশেষে তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ, আগড়ুম বাগড়ুম ভাবতে ভাবতে নিজের ভিতর নিজেকে হারিয়ে ফেলা, এও করতে হবে। বিরাট প্ল্যান! কিন্তু প্ল্যানিঙের সাথে কি রাহাতরা যায়? যায় না। প্ল্যান করতে করতে আর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই সবার আগে আগড়ুম-বাগড়ুম ভাবনার অতলে হারায় গেল সে। কখন কিভাবে টয়লেট সারল, চা বানাল আর বারান্দায় এসে হাঁটাহাঁটি শুরু করল তা বান্দা নিজেও ঠিক  জানে না, ঘোর ভাঙল ফস করে নিজের হাতে জ্বলে উঠা ম্যাচের কাঠির আগুন দেখে। চমকে উঠে আপন মনেই হাসল সে কিছুক্ষণ। বুক ভরে টেনে নিল ঠান্ডা ভেজা বাতাস। তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করল হাতে ধরা সিগারেটটা। বুক, মাথা হাল্কা লাগতেসে। এখন ঘরে ঢুকা যাক। দেখা যাক তার সদ্য লেখা গল্পটার রেসপন্স কেমন আসছে।


মাশাল্লাহ খারাপ না! "লাইক" পাওয়ার একটা ধারা আছে, এই টাইমের ভিতর এতগুলা লাইক পাওয়া মানে লেখা হিট। এর থেকে বেশি সময় লাগলে ধরে নিতে হবে পাঠক দোনামনায় আছে, গল্পটা সবাই আপন করে নিতে পারে নাই। আর কম সময়ের মধ্যে পেলে ধরে নিতে হবে গল্পটা ঠিক জমে নাই! চটুল টাইপের হইসে! ধুপধাপ লাইক পড়বে কিছুক্ষণ, তারপর কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই ভুলে যাবে। আলহামদুলিল্লাহ এটায় এ দুইয়ের কোন কুলক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। লাইক, কমেন্টের নোটিফিকেশনের সাথে সাথে হেলদি পরিমাণ ম্যাসেজ ও আসছে দেখা যাচ্ছে। লাইক, কমেন্ট নিয়ে তার মাথাব্যথা নাই। লাইক সুস্থ গতিতে আগাচ্ছে, কমেন্টের জবাব দেয়া লাগবে না, কিন্তু ম্যাসেজ ইনবক্সটা চেক করা লাগে। পাবলিক পাবলিকলি কমেন্ট না করে প্রাইভেটলি কি বলছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ।

ম্যাসেজ চেক করার ঠিক আগমূহুর্তে তার হঠাত সেই অদ্ভুত মেয়েটার কথা মনে পড়ল। ইয়াল্লাহ এই এত ম্যাসেজের মধ্যে ওই মেয়েটার ম্যাসেজও কি আছে নাকি! গত কয়েকদিন ধরে হঠাত হঠাত মেয়েটার ম্যাসেজ পাচ্ছে সে। খুব ভদ্র ভাষার সিম্পল ম্যাসেজ। কোন প্রেম-পিরিতি-রাগানুরাগের ব্যাপার স্যাপারের ইঙ্গিত থাকে না। সাধারণ শুভাকাঙ্ক্ষী  ভক্ত ফলোয়ারের মতই মনে হয় আপাতদৃষ্টিতে। কিন্তু, রাহাতের কেমন যেন খটকা খটকা লাগে। এ ঠিক সাধারণ লেখা ভাল লাগার আবেগ থেকে দেয়া ম্যাসেজ যেন নয়, বরং মেয়েটা যেন অপেক্ষা করে থাকে কখন রাহাত কোন লেখা দিবে আর সেই লেখা পড়ে ভাল লাগার কথা জানানোর অজুহাত কাজে লাগিয়ে সে ওর সাথে কথা বলবে। এমন কেন মনে হয় রাহাত নিজেও জানে না। মেয়েটা ছ্যাবলা নয়। তার মাঝে একফোটাও গায়ে পড়া ভাব নাই। বরং ভীষণ রকমের ব্যক্তিত্ব, পরিমিতবোধ আর উচ্চশিক্ষার ছায়া মিশে থাকে তার কথার পরতে পরতে। কিন্তু রাহাতের ইনট্যুশন খুব প্রখর। ওর স্বজ্ঞা ইংগিত দিচ্ছে যে এই মেয়ে শুধু তার লেখার ভক্ত না, এই মেয়ে তাকেই চায়, লেখা তার কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম মাত্র!

হয়ত অতিকল্পনা। কিন্তু কথায় আছে না, ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। রাহাত এমন ই এক ঘর পুড়ে শিককাবাব হয়ে যাওয়া হতভাগ্য গরু বিশেষ। বেশ কিছুদিন আগে তার ব্রেক আপ হয়ে গেছে। বুক পুড়ে অঙ্গার। প্রচন্ড ভালবাসত সে মেয়েটাকে। বহুদিনের সম্পর্ক ছিল তাদের। তাদের পরস্পরের প্রতি এতটা ডেডিকেশন, এতটা বোঝাপড়া ছিল যে আর কেউ দূরে থাক, খোদ রাহাতও কোনদিন ঘুণাক্ষরে কল্পনা করে নি যে তাকে প্রায় উন্মাদিনীর মত ভালবাসা সেই শ্যামলা ছোট্ট মেয়েটি একদিন এমন নোংরা ভাবে ধোঁকা দিয়ে চলে যাবে। সেই মেয়ে আসলে কোনদিন ই ভালবাসেনি তাকে। ব্যবহার করেছে। সময় কাটিয়েছে। পুতুল খেলা করে আঁশ মিটিয়ে ছুড়ে ফেলে চলে গেছে। আর হতভম্ব রাহাত বুর্বক হয়ে যেন চারপাশের পৃথিবীটাকে নতনভাবে চিনতে পেরেছে। ওই শেষ। এরপর আর কোনদিন ই কাউকে মন থেকে ভালবাসতে শিখেনি রাহাত। ক্ষণিকের মোহে মাঝে মাঝে এর ওর প্রতি মনোযোগ যে যায় নি তা না। দুয়েকজনের প্রস্তাবে তো সাড়াও দিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু প্রতিবার ই সপ্তাহ না ঘুরতেই সে বুঝে যায়, নাহ্‌ সম্ভব না! সেই শ্যামলা মেয়েটা, সেই মেয়ের স্মৃতিগুলোই এখনো তার বুকজুরে রাজত্ব করে। অন্য কাউকে সমান ঘনিষ্ঠতায় ভালবাসা তার মত গরুর পক্ষে স্রেফ সম্ভব না।

এই মেয়েও যদি তাকে সেই মোহে ফেলতে চায় তাহলে তাকে আগে থাকতেই মানে মানে কেটে পড়তে বাধ্য করবে সে। একটা বিশাল পপুলার পেইজের পপুলার রোমান্টিক গল্পকার সে। মেয়েদের আগ্রহ, মেয়েদের প্রস্তাবে সে খুবই অভ্যস্ত। মেয়েদের প্রস্তাব পেলেই বিচলিত হয়ে উঠার বান্দা নয় সে। এই মেয়ে আগাতে চাইলে তাকেও ঠান্ডা করে ফিরায় দেয়া তার পক্ষে কোন ব্যাপার ই না। এ ব্যাপারে সে পুরো আত্মবিশ্বাসী।

ইনবক্সে ক্লিক করে সে প্রথমেই মেয়েটার ম্যাসেজ আসছে কিনা চেক করে নিল। আসছে। কিন্তু কপাল কুঁচকে গেল রাহাতের। এ কি! মাত্র দুইটা শব্দ লেখা যে!! "ভালই হইসে"! ভালই হইসে মানে কি? ভাল হইসে আর ভালই হইসের মধ্যে যে একটা "ই"-এর পার্থক্য সেই "ই"টাই মুগুরের মত কষে আঘাত করল যেন। মূহুর্তের মধ্যেই ফুস করে তার গল্প লেখার আগ্রহ, তৃপ্তি, ভাব, লেখা গল্পের রেসপন্স জানার উৎসাহ সবকিছুই হারায় গেল।চারদিক খালি খালি মনে হতে লাগল। নিজেকে মনে হল একটা ন্যাড়া মাঠে একলা চরা গাধা!

- কি সব হাবিজাবি লিখি যেগুলা এমন ভালই হইসে টাইপের হয়! বাল! যথেষ্ট হইসে। লিখুম না আর কিছু। এইসব পোলাপাইন্যা বালছাল লিখ্যা কারো হাসির পাত্র হমু না আমি। ভদ্রতা কইরা "ভালই হইসে" কইসে। কি ভালই হইসে সেটা মনে হয় আমি জানি না! চ্যাটের বাল হইসে আমার! ধুর!
ডিলিট করুম? ধুর! ডিলিট করলেও ঝামেলা। পাবলিক সিম্প্যাথি দেখায় জেরা করতে করতে শোয়ায় ফেলব। হুদাই ত্যানা পেঁচাইব। এখন এগুলা ভাল্লাগতেসে না কিছু। ধুর!

No comments:

Post a Comment